দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

কানাডার টরন্টো পিয়ারসন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুটি জাল কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি (সিবিএসএ) পোর্ট স্ট্যাম্প পাচারের দায়ে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের (পিআইএ) এক বিমানবালাকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন আদালত। তবে কেন তিনি ওই জাল সিলগুলো কানাডায় নিয়ে যাচ্ছিলেন, তা নিয়ে এখনো রহস্য কাটেনি।
৪৬ বছর বয়সী হিনা সানি ২০২৪ সালের ২৮ মার্চ পিআইএর দায়িত্বে টরন্টো পিয়ারসনে পৌঁছালে সিবিএসএ কর্মকর্তারা তাকে দ্বিতীয় দফা তল্লাশির জন্য থামান। এ সময় তার একটি স্যুটকেস থেকে দুটি জাল সিবিএসএ পোর্ট স্ট্যাম্প উদ্ধার করা হয়।
কানাডার সীমান্ত কর্মকর্তারা পাসপোর্টে পোর্ট স্ট্যাম্প ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি বৈধভাবে দেশে প্রবেশ করেছেন—এর প্রমাণ দেন। পাসপোর্টে প্রবেশের তারিখ অনেক ক্ষেত্রে কানাডায় একজন বিদেশি নাগরিক কতদিন অবস্থান করতে পারবেন, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এ ধরনের জাল সিল ব্যবহার করে কারও অভিবাসন-সংক্রান্ত ইতিহাস বা বৈধ অবস্থান সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য তৈরি করা সম্ভব।
বৃহস্পতিবার ব্র্যাম্পটন কোর্টহাউসে রায় ঘোষণার সময় লাল পোশাক পরা সানির চুল ছিল লম্বা পনিটেইলে বাঁধা। উর্দু দোভাষীর সহায়তায় বিচারক অ্যান্ড্রু ফলস তাকে পাচার এবং জালিয়াতির সরঞ্জাম আমদানির দুটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন।
রায়ে বিচারক বলেন, অভিযোগগুলো যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের ঊর্ধ্বে প্রমাণ করতে প্রসিকিউশন সফল হয়েছে।
আদালতে নিজের পক্ষে সাক্ষ্য দেন সানি। তিনি জানান, নোমান নামের এক পরিচিত ব্যক্তি তাকে কানাডায় নিয়ে আসার জন্য জুতা ও পোশাক দেন। পরে ব্যাগ খুলে তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে একটি প্যাকেটের মধ্যে সিলগুলো দেখতে পান। সানি দাবি করেন, তিনি সঙ্গে সঙ্গে নোমানকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে নোমান জানান, কানাডায় যে খুচরা ব্যবসা শুরু করতে যাচ্ছেন, তার জন্য এগুলো প্রয়োজন।
সানি আদালতকে আরও জানান, তিনি সিলগুলোকে সন্দেহজনক কিছু মনে করেননি। এমনকি জুতা পরীক্ষা করার সময় ভেতরে কিছু লুকানো আছে কি না নিশ্চিত হতে পিন দিয়ে সেগুলোও পরীক্ষা করেছিলেন। পাকিস্তান ছাড়ার আগে তাকে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা তল্লাশির মধ্য দিয়েও যেতে হয়েছিল বলে জানান তিনি।
তবে প্রসিকিউশন যুক্তি দেয়, সানি জানতেন সিলগুলো কী কাজে ব্যবহার করা হয় এবং এগুলো কানাডায় নিয়ে যাওয়ার পেছনে তার আর্থিক উদ্দেশ্য ছিল। এক সিবিএসএ কর্মকর্তা আদালতে জানান, হাতল আলাদা হলেও সিলগুলোর এমবসড ও লেখা অংশ সংস্থাটি ব্যবহৃত আসল সিলের সঙ্গে মিল রয়েছে।
সানি আটক হওয়ার সময় কর্মকর্তাদের সহযোগিতা করেছিলেন এবং নোমানের ফোন নম্বর দিয়ে তাকে ডেকে এসব সামগ্রী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। তবে কর্মকর্তারা সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি।
রায়ের লিখিত ব্যাখ্যায় বিচারক ফলস সানির সাক্ষ্যকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেননি। তিনি বলেন, সানি জানতেন যে তাকে জুতা ও পোশাক দেওয়া হবে, কিন্তু সিল পাওয়ার কথা ছিল না। অথচ অপ্রত্যাশিতভাবে সিল পাওয়ার পর সেগুলো পরীক্ষা না করে তিনি জুতাগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করেছিলেন। বিচারকের মতে, এই বক্তব্য ‘যৌক্তিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়’।
সীমান্ত-সংক্রান্ত মামলায় পাচারের অভিযোগ তুলনামূলকভাবে সাধারণ হলেও পোর্ট স্ট্যাম্পের মতো সরকারি জালিয়াতির সরঞ্জাম নকল ও পাচারের ঘটনা বিরল বলে জানা গেছে।
প্রাথমিকভাবে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল, সানিকে অন্য ব্যক্তিদের পাসপোর্ট বহনের কারণে আটক করা হয়েছিল। পরে জানা যায়, ওই তথ্য সঠিক ছিল না।
সানির সাজা ঘোষণার আগে আদালত আগামী নভেম্বরে একটি প্রি-সেন্টেন্সিং রিপোর্টের জন্য তাকে ফের হাজির হতে বলেছেন। জালিয়াতির সরঞ্জাম আমদানির অভিযোগে কী ধরনের সাজা হতে পারে, সে বিষয়ে আইনজীবীদের কাছ থেকে সহায়তা প্রয়োজন বলেও বিচারক জানিয়েছেন।
সানি ও তার আইনজীবী আমিনা জুসিক এ বিষয়ে কোনো সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হননি। সিবিএসএও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। গ্রেপ্তারের পর থেকেই সানি কানাডায় অবস্থান করছেন এবং জাল সিল উদ্ধারের পর পিআইএ তাকে দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে।
পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সানি খণ্ডকালীন মডেল হিসেবেও কাজ করেন এবং ফেসবুক ও টিকটকে তার অনুসারীর সংখ্যা ১৫ হাজারের বেশি।
এদিকে, কানাডা রুটে পিআইএর কর্মীদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। সানিকে আটকের আগের এক বছরে টরন্টো থেকে পাকিস্তানগামী ফ্লাইটে দায়িত্ব পালন করা পিআইএর ১০ জন ক্রু আর দেশে ফেরেননি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২০ সাল থেকে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, কানাডায় পৌঁছানোর পর অন্তত ১৫ জন ক্রু আর ফেরার ফ্লাইটে ওঠেননি এবং তাদের হদিস পাওয়া যায়নি।
কর্মীদের কানাডায় থেকে যাওয়ার প্রবণতা ঠেকাতে পিআইএ পরবর্তীতে কানাডা রুটে ৫০ বছরের বেশি বয়সী ক্রু সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।